ভালোবাসা, মৃত্যু, তারপর?

  • 27 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 140 view(s)
  • লিখেছেন : অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
 ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। যতদূর শুনেছি, শাস্ত্রানুসারে সেই ধর্মে নাস্তিকতা অভ্যাসেরও কোনও পরিসর নেই। ঠিক এই কারণেই তো ধর্ম-সংস্কারের প্রয়োজন। প্রয়োজন সর্বোচ্চ প্রতিবাদ। আধুনিক পৃথিবীতে মানবতা ভিন্ন, অন্য কোনও ধর্মে বিশ্বাস রাখা চলে না। আধুনিক পৃথিবীতে মানুষে মানুষে নিখাদ ভালোবাসার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নয়‌। যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসারী মৌলবাদীরা, যখনই তার বিরুদ্ধাচারণ করবে, তখনই প্রতিবাদ হোক তাদের বিপক্ষেই। এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ারই তো প্রত্যাশী আমরা।

 ছবির কথা দিয়ে শুরু করা যাক। সে ছবি আমি নিজে দেখেছিলাম। তেমন ছবি আপনারাও দেখে থাকতে পারেন।

 

হেমন্ত বিষাদের কাল। তবু কে না জানে, এমন প্রাক-শীতের হেমন্ত-শহরেই বসন্তের রঙ ধরে। মানব-মানবীর ভালোবাসার জন্ম হয়।

 

সেদিন একাডেমি চত্বরে গিয়েছিলাম। চায়ের দোকানে অপেক্ষা কিছুক্ষণ। পিছনে মোমোর দোকানে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে। চেয়ার টেনে নিয়ে তারা মুখোমুখি বসে। লোকজন প্রায় নেই আজ এ’চত্বরে কোথাও। পুজো শেষের বিকেল। এবারের পুজো কেমন গিয়েছে, সেও আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে পোশাকেই স্পষ্ট ছেলেটি ও মেয়েটি বিশ্বাসে মুসলমান। মেয়েটির মাথার ওড়না আকাশি নীল রঙের। ছেলেটি মেয়েটিকে রাগাতে চায়। মেয়েটি ফোনে মগ্ন। ছেলেটি তার গাল‌ ছুঁয়ে দিল। মেয়েটি বিরক্ত হচ্ছে। ছেলেটি আবারও তার নাকের ডগাটুকু ছোঁয়। মেয়েটি কপট রাগে ফোন রেখে দিল এবার। মোমো এসে গেছে। দুজনে খাবারে মন‌ দেয়।

 

দুজন, দুজনের দিকে তাকায়।

 

সদ্য ‘সনাতন’ হয়ে ওঠা বাঙালির বিচারে ‘পাক্কা পাখণ্ডী’ হয়ে ওঠা আমি এভাবে পর-বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে ঠিক কতগুলি নরকবাসের যোগ্যতা অর্জন করলাম সেই নিয়ে বড় একটা ভাবিত নই। বরং কট্টর ইসলামিরাও যুগলের এহেন আচরণে কতখানি কুপিত হবেন, সেই নিয়েই চিন্তাবোধ হলো বেশি। কারণ, স্বভাবতই সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘটনা। প্রকাশ্যে ভালোবাসার উদযাপন - এই বিষয়ে মৌলবাদী মোল্লাতন্ত্রের এক চূড়ান্ত অমানবিক প্রতিক্রিয়ার নজির আমরা অতি সদ্যই প্রত্যক্ষ করেছি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এদেশের গৈরিক ভক্তকুল, তাঁদেরও অন্তত একজনের সামাজিক বক্তব্যে খেয়াল করলাম - সেই ‘নব্য-সনাতনী’ মানুষটিও সৌদি আরবের কৃতকর্মের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, এবং মন্তব্য রেখেছেন - যস্মিন দেশে যদাচারমের মন্ত্রই সকলের মেনে চলা উচিত।

 

হায় ভালোবাসা, হায় তোমাদিগের মৌলবাদ!

 

আবারও একবার সেই আকাশি নীল ছবিটিকে দেখে নিই চলুন। এক নারী ও এক পুরুষ পাশাপাশি। চোখের দৃষ্টি সলজ্জ। সামান্য স্পর্শের অবকাশ। নেহাত ‘পাখণ্ডী’ না হলে কারই বা এই সৌন্দর্যের প্রতি বিরাগ সম্ভব?

 

ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। যতদূর শুনেছি, শাস্ত্রানুসারে সেই ধর্মে নাস্তিকতা অভ্যাসেরও কোনও পরিসর নেই। ঠিক এই কারণেই তো ধর্ম-সংস্কারের প্রয়োজন। প্রয়োজন সর্বোচ্চ প্রতিবাদ। আধুনিক পৃথিবীতে মানবতা ভিন্ন, অন্য কোনও ধর্মে বিশ্বাস রাখা চলে না। আধুনিক পৃথিবীতে মানুষে মানুষে নিখাদ ভালোবাসার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নয়‌। যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসারী মৌলবাদীরা, যখনই তার বিরুদ্ধাচারণ করবে, তখনই প্রতিবাদ হোক তাদের বিপক্ষেই। এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ারই তো প্রত্যাশী আমরা। অথচ এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ারও জন্ম-ইতিহাস বহুকালের।

 

চণ্ডীদাস সেই কবে লিখেছিলেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই . .” লালন গেয়েছিলেন জাতপাতের অসারতার গান। আমরা সেই সবকিছুকেই ক্রমশ বিস্মৃত হয়েছি। আমরা পিছনের দিকেই ক্রমশ এগিয়েছি কেবল।

 

সৌদির বিস্তারিত ঘটনাটি এই প্রসঙ্গে চুম্বকে বলে নেওয়া প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের নাগরিক এক মহিলা ও এক পুরুষ মক্কার একটি মসজিদ চত্বরে আনন্দময় মুহূর্তে ভালোবাসার চুম্বনে আবদ্ধ হন। উল্লেখ্য, ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুইজনেই সাবালক। অধিকাংশ সংবাদে প্রকাশ, তাঁরা বিবাহিত, ও মহিলাটি সেই আনন্দঘন মুহূর্তে নিজের আসন্ন সন্তান-সম্ভাবনার কথা সঙ্গী পুরুষ মানুষটিকে জানাচ্ছিলেন। এরই প্রতিক্রিয়াতে সেই পুরুষ, সেই নারীকে তার কপালে চুম্বন করেন। কপালে। (যৌনগন্ধ খুঁজে বেড়ানো সকল মানুষের জন্য এই প্রসঙ্গে ‘কপালে’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি করতে হলো। বাকিরা এ’ত্রুটি মার্জনা করবেন।)

 

এমতাবস্থায়, সৌদি আরবের আইন অনুসারে সেই ‘দম্পতি’র বিরুদ্ধে মক্কার মসজিদ-চত্বরে শালীনতা-ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে,

 

তাঁদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়।

 

আরো একবার,

 

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়।

 

প্রথমেই, আন্তর্জাতিক আইনের কথা স্মরণে রেখেই, যে প্রশ্ন সর্বাগ্রে উঠে আসতে চায় - ভিনদেশের দুই নাগরিককে সরাসরি ‘মেরে ফেলা’র অধিকার সৌদির যদি বা থেকে থাকেও - সেই দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে, তার আগে অবধি সংশ্লিষ্ট দেশ (বাংলাদেশ) বা তার দূতাবাসকে জানানোর বিষয়টিও কি দরকার পড়ল না? এমনকি ঘটনার পরবর্তীতে বাংলাদেশের তরফেও কোনওরকম কূটনৈতিক প্রতিবাদ সামনে এলো না। স্বভাবতই ভারতীয় ভক্তকুল এই সম্পূর্ণ বিষয়টিকে নিয়ে প্রায় উদ্বাহু নৃত্যে মত্ত হয়ে পড়েছেন - তাদের উপেক্ষা করেই, সংশ্লিষ্ট দেশ ও ধর্মের প্রতিনিধিদের কাছে প্রাথমিক ভাবে এই প্রশ্নই তুলতে চাই, আইনত যদি মৃত্যুদণ্ডই সমীচীন হয়, তবু সেই দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রেও সমস্ত রকমের প্রক্রিয়া-প্রকরণ কি আদৌ এক্ষেত্রে মেনে চলা হয়েছে? এই বিষয়েরই প্রকাশ্য স্পষ্টীকরণ জরুরি।

 

দ্বিতীয়ত, কোন নীতি অনুসারে - কপালে চুম্বন - এমন একটি সামান্য ও সুন্দর বিষয়কে ধর্মস্থানের শালীনতা লঙ্ঘনের মাপকাঠিতে রাখা হচ্ছে, ও সেই ‘লঙ্ঘন’কে লঙ্ঘন বলেও যদি বা ধরে নেওয়া হয়, তার শাস্তি হিসেবে একেবারে মৃত্যুদণ্ডের কথাই উঠে আসছে? এ’কথা সত্য পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম-প্রধান দেশগুলিতে এমন অনেক ন্যক্কারজনক আইন আজ অবধি বলবৎ হয়ে রয়েছে। সেই সব আইনের বিরুদ্ধেই আজ সামগ্রিক নাগরিক প্রতিবাদ জরুরি। একথাও সত্যি, এই প্রতিবাদ সংশ্লিষ্ট ধর্ম ও দেশের নাগরিকদের অভ্যন্তরেই সর্বাগ্রে ও সর্বাধিক তীব্রতায় উঠে আসা প্রয়োজন। তবু তার পাশাপাশি, সেই আওয়াজ উঠে আসার ক্ষেত্রে অনুঘটকের দায়িত্ব পালনে আমাদেরও সকলেরই এগিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। এই কর্তব্য একই মাত্রায় আমাদের উপরেও বর্তায় বলে মনে করছি।

 

আজকের এই নিবন্ধটি যেন এই বিষয়ে একমাত্র নিবন্ধ হয়ে থেকে না যায়, সেই দায়িত্ব পালনে পাঠকবর্গকেই সচেতন হতে অনুরোধ করব।

 

আমরা এক অদ্ভুৎ সময়ের বাসিন্দা। বিশেষত সভ্য, ভদ্র, বাঙালি পরিসরে যে মেধার গৌরব এককালে অবশিষ্ট ছিল, আজ তার সবটুকুই প্রায় অপসৃত। ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে, লয়প্রাপ্তির অপেক্ষায়। তাই সৌদির ঘটনায় ভদ্রবিত্ত হিন্দু বাঙালির প্রচ্ছন্ন উল্লাস, অথবা এড়িয়ে চলা, চোরবাগানের ঘটনায় হিরণ্ময় নীরবতা, ও বামপন্থী বইয়ের দোকান থেকে ‘পথের দাবি’র মতো এক-একটি বইকে নোংরা হাতে তুলে নিয়ে রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্যে পদদলিত করার মতো ঘটনায় নীরব অজ্ঞানতার ভান।

 

শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন ভালোর ভানও ভালো। সেই একই সূত্র ধরে বলতে চাইব, সৌদির ঘটনা যদি মৌলবাদের নজির বলে মনে করা হয় (মনে করারই বা কী আছে? এ নিঃসন্দেহে মৌলবাদেরই উদাহরণ), একই সঙ্গে অধুনা ‘সনাতনী' বাঙালি’র প্রতিটি প্রাত্যহিক কাজেকর্মেই ‘দুর্দান্তরূপে সনাতন’ হয়ে ওঠার প্রতিটি প্রচেষ্টা, সেই মৌলবাদেরই অন্য পিঠ কেবল। ভদ্রবিত্ত বাঙালি প্রসঙ্গে শতবর্ষ আগেকার সেই নীরদবাবুর মূল্যায়নই প্রতিটি অক্ষরে সঠিক বলে মনে হয়। বিশেষত ২০২৬এর মে মাস-পরবর্তীতে সেই বিষয়ে আমার আর এতটুকুও সংশয় অবশিষ্ট নেই।

 

বরং মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমরা আজ স্বল্পমেধার, অন্যস্বরেরাই একসুরে, এককাট্টা হই চলুন। যুগে-যুগান্তরে শ্রমের মাধ্যমেই পাল্টা ইতিহাস রচনা করা গিয়েছে। এই লড়াইতে ‘অশিক্ষিত’ লালন অথবা ‘ডিগ্রিহীন’ রবিঠাকুরেরাই (নোবেল না পাওয়া অবধি ভদ্রলোক, ভদ্রবিত্ত বাঙালি পরিসরে ‘শান্তিনিকেতনের স্কুলমাস্টার’ হিসেবেই অধিক পরিচিত ছিলেন) আমাদের পথপ্রদর্শক।

 

পথ যতই কঠিন হোক, আমাদের আদর্শ থেকে আমরা যেন বিচ্যুত না হই। সত্য, অহিংসা, ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি আমাদের আনুগত্য যেন অটুট হয়। মানুষের অধিকার, ভালোবাসার অধিকারের দাবিতেই আমাদের অক্ষয় পথচলা। সৌদির মতো এমন প্রত্যেক ঘটনায় আমরা যেন আরও একটু করে সংঘবদ্ধ হই, আরও একটু সোচ্চার হই অমানবিকতার বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে, জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আমরা যেন আরও একটিবার সোচ্চারে সরব হই।

লেখক : বিজ্ঞানী, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক 

ছবি : সংগৃহীত 

0 Comments

Post Comment