- 06 January, 2026
- 0 Comment(s)
- 810 view(s)
- লিখেছেন : তামান্না
"তাও নিজের দ্যাশ তো দ্যাশ হয়।" তথ্যসূত্র -https://youtu.be/ZgBMLdjdnS4?si=fgIx7TUkQkuzOSkh ) কী এমন দ্বেষে, নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়? বাংলা বলার অপরাধ! নিজের দেশকে, কোন কুচক্রীর দল দেশ ভাবতে দিচ্ছে না? পুশ ব্যাক করে ভিনদেশি করে দিচ্ছে! আইনি নথিপত্র থাকার পরেও কেন শাস্তি পেতে হচ্ছে? জাতিগত ও ধর্মীয়গত বিদ্বেষকে একই সঙ্গে মিলিয়ে ডাটা চচ্চড়ি বানিয়ে,তাহারা কাহারা মুচকি হাসি হাসিতেছেন? সোনালি বিবিকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছিল। তিনি দেশে ফিরে সাংবাদিকদের বলছিলেন,-নিজের দেশে ফিরে তিনি স্বস্তি বোধ করছেন। কাজের সূত্রে স্বামী দানিশ শেখের সঙ্গে ৮ বছরের ছেলেকে নিয়ে দিল্লির রোহিণীর ২৬ নম্বর সেক্টরে থাকতেন।বাঙালি হবার অপরাধে গত ১৭ জুন ৬ জনকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশ। একইভাবে, বীরভূমেরই মুরারইয়ের বাসিন্দা সুইটি বিবি এবং তার দুই নাবালক ছেলেকেও গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় দিল্লি পুলিশ। দিল্লি পুলিশ নথি যাচাই-বাছাই করে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাননি,মনে মনে তাদের বাংলাদেশের নাগরিক ভেবে পুশ ব্যাক করে দেন বাংলাদেশে। পুশ ব্যাক করার সময়েই সোনালি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তার পরে তাঁদের সকলের জায়গা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংশোধনাগারে। উদ্বেগ ছিল সোনালির গর্ভাবস্থা নিয়ে। সোনালি জানিয়েছেন -"দিল্লি পুলিশের হাতে পায়ে ধরেও রক্ষা পাননি।‘’(তথ্যসূত্র-আনন্দবাজার.com,৭ই ডিসেম্বর ,২০২৫)
কাশ্মীরের পহেলগামে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে "হিন্দু পর্যটকদের ওপরে প্রাণঘাতী হামলা" হওয়ার পরেই বাঙালি মুসলিমদের হেনস্থা শুরু করে পুলিশ। অবৈধ ভাবে পুশ ব্যাক করার সময় ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ অগ্রাহ্য করে, ফোন নথি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী কেড়ে নেওয়া হয় যাতে আটক হওয়া ব্যক্তিরা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে না পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউমান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারত কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত বাংলাভাষী মুসলমানকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী অভিহিত করে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর ভারতীয় নাগরিক। হিউমান রাইটস ওয়াচ এ নিয়ে এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলছে গত ৭ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ভারত দেড় হাজারেরও বেশি মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। হিউমান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলছেন, ভারতীয় নাগরিকসহ বাঙালি মুসলমানদের দেশটি থেকে যথেচ্ছভাবে বিতাড়িত করে দিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি বৈষম্য তৈরি করছে।”(BBC NEWS বাংলা, ২৬ জুলাই,২০২৫) উল্লেখ্য প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে- “কিছু ক্ষেত্রে সীমান্ত রক্ষীরা আটক হওয়া ব্যক্তিদের মারধর করেছে এবং যথাযথ ভাবে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই জোর করে বাংলাদেশ সীমান্ত পার করতে বাধ্য করছে। সীমান্ত পার করে দেওয়ার পরে নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পেরেছেন, এরকম ডজন-খানেক মানুষকে ভারত আবারও ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পর একটি অজ্ঞাতনামা স্থানে সোনালি ও অন্যরা সাহায্যের জন্য কাকুতি-মিনতি করছেন। (তথ্যসূত্র-প্রথম আলো ২৩ আগস্ট, ২০২৫) দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর গত ৫ ডিসেম্বর সোনালি তার পুত্রকে নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তার স্বামী এখন দেশে ফিরতে পারেননি। আচানক বাঙালি-বিরোধের নয়া আচকান পরে মাঠে নেমেছে যারা, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বারংবার একই কাজ করে যাচ্ছেন! নিজের দেশেই প্রাণ খুলে বাঁচতে পারছেন না! এই কষ্টের থেকে বড় কষ্ট কী আছে? অতনু সিংহ জাহাঙ্গিরপুরী, হিন্দু জাতিবাদ এবং বাংলা বিদ্বেষ প্রবন্ধে জানিয়েছেন - "হিন্দুত্ববাদী ভারতে বাঙালি মুসলমান দ্বিগুণ নির্যাতিত ,একবার মুসলমান হবার দোষে, আরেকবার বাঙালি হবার কারণে! "(তথ্যসূত্র-https://chintaa.com/index.php/chinta/printAerticle/551/bangla?fbclid=IwRlRTSAPBsmdleHRuA2FlbQIxMQBzcnRjBmFwcF9pZAo2NjI4NTY4Mzc5AAEeY5oEbdnW9p0K1ZSX3uCn1jqVSQxnTDo5AmEBFsDuyxsJyxU5PpLkcu3VThI_aem_X-DKzbgyf3YUk7S845rjrw) ছলে বলে কৌশলে অস্ত্বিত্বের সংকট সৃষ্টি করে,অবৈধ নাগরিকত্বের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে,শাসক দল যে করাল খেলার সূত্রপাত করেছে, তাতে সবহারাদের দল তলিয়ে যাচ্ছে! হরিয়ানার গুরুগ্রাম অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের বিশেষভাবে নিশানা করা হয়েছিল। পরিচয় যাচাইয়ের নামে বিশেষ করে মুসলিম শ্রমিকদের আটক, বৈধ পরিচয়পত্র অস্বীকার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি অসম থেকে আসা বাংলাভাষী শ্রমিকদেরও একইভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকায় বাঙালি শ্রমিকদের উচ্ছেদ, জল-বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া এবং পুলিশের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকায় বাঙালি মাছ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।(তথ্যসূত্র -আজাদ গণ মোর্চা-র মুখপত্র মাতৃভূমি,আগষ্ট,২০২৫) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইসকল শ্রমিকরা তাদের পরিবার নিয়ে বাস করেন। তাদের স্ত্রীরা গৃহকর্মী, রাঁধুনি, আয়ার কাজ করেন। বিপাকে পড়ে অনেক নারী শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। এমনিতেই নারীরা কাজের ক্ষেত্রে যে শ্রম দেন সেই পরিমাণ অর্থ তারা পাননা, তারপরে কাজ হারিয়ে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক মুসলিম নারীরা দিল্লি ও গুরুগ্রামে কাজ করেন। এই কাজকে ভরসা করে অনেকে গ্রামের বাড়ি করার জন্য ঋণ নিয়েছেন। মেয়ের বিয়ের গয়না গড়ানোর জন্য টাকা সঞ্চয় করছিলেন। এমনকি এই কাজ থেকে উপার্জন করে সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। কারও উপার্জনের টাকায় বাবা- মায়ের চিকিৎসা চলে। কেউ কেউ কাজে এসেছিলেন-টাকা জমিয়ে গ্রামে এক টুকরো জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাই করবেন ভেবে! এরকম অনেক অনেক স্বপ্ন অধরা থেকে গিয়েছে বাঙালি মুসলিম দোষে দুষ্ট শ্রমিকদের। আগস্ট মাসে গুরুগ্রামে বাঙালি মুসলিম নিধন যজ্ঞ শুরু হলে প্রথমেই শ্রমিকদের আশ্রয়স্থল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বাড়ির মালিকরা বাড়ি ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেন। তাই অনেককে কাজ হারিয়ে ঘরে ফিরে যেতে হয়েছে। সোনালি জানিয়েছেন -তিনি আর কোনদিন দিল্লিতে কাজ করতে ফিরে যাবেন না। এরকম অনেক সোনালিকে তাদের কর্মস্থল ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে । জুলাই(২০২৫) মাসে মালদার চাঁচলের শ্রমিক মুক্তার খান তার স্ত্রী ও সন্তান ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে দিল্লি পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আবার, নদিয়ার শান্তিপুরের বাসিন্দা পেশায় শ্রমিক সাইদুল শেখ এবং তাঁর স্ত্রী শাকিলা বিবিকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ৷ বাংলাদেশি সন্দেহে শাকিলা বিবিকে আটক করা হয় ৷ স্ত্রী আটক হতেই পুলিশের আতঙ্কে গা-ঢাকা দেন সাইদুল শেখ ৷ তাঁদের পরিবারের দাবি, গত ষোলো বছর ধরে দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করেন সাইদুল এবং তাঁর স্ত্রী শাকিলা বিবি ৷ তাঁদের বাড়ি নদিয়ার শান্তিপুর পুরসভার নয় নম্বর ওয়ার্ডে ৷ (Etv Bharat, ২৯ জুলাই,২০২৫)
দিল্লি ও গুরুগ্রামে নির্মাণ- শ্রমিক, গাড়ি পরিষ্কারক, গৃহকর্মী, রাঁধুনি, আয়া, কুকুর হাঁটানোর কর্মী, ময়লা পরিষ্কারক কর্মী, জমাদার, কলমিস্ত্রির মতো নানান পেশায় যুক্ত আছেন পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের গ্রামাঞ্চল থেকে আগত বাঙালি মুসলিম শ্রমিকরা। অথচ আজকে তাঁরাই নিজেদের দেশে সন্দেহের চোখে দেখা এক ‘অবাঞ্ছিত’ শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। তাদের বারবার ‘রোহিঙ্গা’ কিংবা ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার ফলে তারা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র তকমা পেয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই শ্রমিকদের কখনো হেনস্তা, কখনো জোরপূর্বক উচ্ছেদ, আবার কখনো নিঃশব্দে গায়েব করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। তাঁরা এখন নিজেদেরই দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এক ভূখণ্ডে, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। বিভিন্ন শহরের বস্তিতে দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের তরফ থেকে কখনো বলা হচ্ছে এই এলাকায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ লুকিয়ে আছে, কখনো তাদের আশ্রয়দাতা বলে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাভাষী ও মুসলিম পরিচয়কে সামনে এনে বারংবার নাগরিকত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। অনেককে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তথাকথিত ‘হোল্ডিং সেন্টারে’, যা কার্যত বন্দিশিবিরেরই অন্য নাম। এই প্রক্রিয়া শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং ক্রমশ একটি ভয়ানক সামাজিক প্রকল্পে রূপ নিচ্ছে-যেখানে ভাষা, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।
নিজের রাজ্যে কর্মসংস্থান হয়নি ফলে যারা বাড়ি-ঘর-পরিবার ছেড়ে, হাজার একটা স্বপ্ন নিয়ে হাজার কিলোমিটার দূরের ভিন্ন রাজ্যে কাজ জুটিয়ে থিতু হতে চেয়েছিলেন, সেখানেও বাদ সাধল এই ‘পুলিশি ভীতি’! কেন? গুরুগ্রামে শ্রমিকদের হেনস্থার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান শ্রমিকরা তাঁদের পরিচয়পত্র দেখানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেগুলোর কোনো মূল্যই পুলিশ দেয়নি। একজন মালদার ছেলে গুরুগ্রামে টোটো চালক হিসেবে কাজ করতেন। তাকে মারধর করা হয়, তারপর দিল্লি-এনসিআরের একটি তথাকথিত ডিটেনশন সেন্টারে পুলিশের ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি তাঁর পরিচয় পত্র দেখাতে চাইলে, পুলিশ তা দেখতে অস্বীকার করেন। (তথ্যসূত্র – ১। LAW An Eyewitness’s Account of the Exodus of Bengali Muslim Migrant Workers in Gurugram, Atish Aziz, thewire.in, Aug 2,2025
২। ভারতে বাঙালি মুসলিমদের অনিশ্চিত জীবন, অতিশ আজিজ, যুগান্তর, ৬ আগস্ট, ২০২৫ )
জুবেইদা খাতুনের বাড়ি নদীয়ার তেহট্টতে তিনি গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৩ রান্নার কাজ করতেন। স্বামীর পেশা ছিল নির্মাণ শ্রমিক। উচ্ছেদের সময় তিনি কাজ হারিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন- দু-পয়সা আয়ের জন্য চোরের মত থাকতে পারবোনা বাপু। নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিলে- মকান মালিক সাফ জানিয়ে দিচ্ছে ভাড়া হবে না, কেউ কেউ আবার ভাড়া দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, তাই গত আগস্ট মাসে গ্রামে ফিরে গেছেন। তিনি জানালেন, তাঁর বাবা অসুস্থ, তাঁর রোজগারের টাকায় চিকিৎসা হত। এখন বাবা বিনা চিকিৎসায় বিছানায় পড়ে আছেন।
সুবুরা বিবির বাড়ি কোচবিহারে, তিনি পনেরো বছর দিল্লিতে কাজ করছেন। জাহাঙ্গীরপুরীতে থাকেন। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিনি জানালেন, অনেক জায়গা থেকে তিনি কাজ হারিয়েছেন, বাঙালি মুসলিম হবার কারণে। আবার বাংলাদেশি বলে ইদানিং তাঁকে ন্যায্য মূল্য দেওয়া হচ্ছে না!
মুনতাহা খাতুন দিল্লির শাহপুর জাট অঞ্চলে বাচ্চাদের আয়ার কাজ করতেন। নদীয়ার করিমপুরে বাড়ি। বাড়িতে অসুস্থ মা ও এক ছেলে থাকে। তাঁর আয় থেকে বাড়ি চলে। তবে তিনি কাজ হারিয়েছে, এখন হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন।
সাঞ্জিদা বেগমের বাড়ি মালদাতে। তিনি গুরুগ্রামে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। আগস্ট মাস থেকে কাজ করছেন না। মালদা ফিরে গেছেন। থাকার জায়গা নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। আবার বিনা কারণে পুশ ব্যাক হবার ভীতি থেকে কাজে ফিরতে চাইছেন না।
রবিনা খাতুনের বাড়ি মুর্শিদাবাদে। গুরুগ্রামে রাঁধুনির কাজ করতেন। বাড়িতে অসুস্থ স্বামী ও ছোট ছেলে মেয়ে থাকে। তাঁর উপার্জনে সংসার চলে। তিনিও আগস্ট মাসে বাড়ি ফিরে গেছেন, তাঁরও পুশ ব্যাকের আতঙ্কে আর কাজে ফেরা হবে না।
গুরুগ্রামে বহুদিন কাজ করছিলেন মেহজাবি। ২৯ জুলাই তিনি ঠিক করেন ২ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার গ্রামে ফিরে যাবেন। গুরুগ্রামে বাংলাভাষী বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে পুলিশের ধরপাকড় শুরু হওয়ায় তিনি ভয় পাচ্ছিলেন—যে কোনো মুহূর্তে তিনি ও তাঁর পরিবারও সেই তালিকায় পড়ে যেতে পারে। তিনি ঠিক করেছিলেন, তাঁর মজুরি তোলার জন্য মাত্র দু’দিন অপেক্ষা করবেন, কিন্তু তাঁর সমস্যা ছিল, নিজের, স্বামীর ও দুই সন্তানকে নিয়ে বর্ধমান যাওয়া। ট্রেনের টিকিট কাটার মতো সঞ্চয়ও তাঁর ছিল না ।
গুরুগ্রামে শত শত বাংলাভাষী শ্রমিক—যাদের বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মুসলিম—পুলিশের ‘ভেরিফিকেশন ড্রাইভ’-এ আটক হয়েছিলেন। এই অভিযান শুরু হয় ২ মে ২০২৫-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি নির্দেশিকার পর। ‘গোপন’ চিহ্নিত ওই নির্দেশিকায় সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের দ্রুত শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। যাদের আটক করা হয়, তাদের ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ নিয়ে গিয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি দেখাতে বলা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নথি থাকলেও কোন কাজে আসেনি। মাহাজাবি জানান- “পুলিশ আমাদের আধার কার্ড বা অন্য কোনো কাগজই দেখছে না,“ওরা কী চায়, আমরা জানি না। মানুষকে মারধর করে, তারপর জিপে তোলে, আর বলে থানায় গিয়ে সব জানাবে।”এই আতঙ্কে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ অন্তত ১,০০০ বাংলাভাষী মানুষ গুরুগ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন; সমাজকর্মীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা ৩,০০০-এরও বেশি।
মুম্বইয়ের মীরা রোড এলাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মুমতাজ–কে কাশিমিরা রোড পুলিশ থামিয়ে বাংলাদেশি বলে অভিযুক্ত করে। পুলিশ তাঁর ফোন কেড়ে নেওয়ার আগে মুমতাজ পশ্চিমবঙ্গে থাকা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন। ভাই মুম্বইয়ে তাঁর এক বন্ধুকে খবর দেন। সেই বন্ধু পরিচয়পত্র নিয়ে থানায় পৌঁছালেও পুলিশ সেগুলোকে ‘ডুপ্লিকেট’ বলে ঘোষণা করে। মুমতাজের অভিযোগ, পুলিশ তাঁকে ভয় দেখায় ও হেনস্থা করে—নির্মাণ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া তাঁর স্বামীর মৃত্যুতেও তাঁকে জড়ানোর চেষ্টা করে। পুলিশ বারবার তাঁর জন্মসনদ চাইছিল, মুমতাজের জন্মসনদ বন্যায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে জমির কাগজসহ নানা নথি পাঠানো হয়। শেষে পঞ্চায়েত প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে মুমতাজের পরিবার স্থানীয় থানায় গেলে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সঙ্গে কাশিমিরা পুলিশের কথা হওয়ার পর তাঁকে ছাড়া হয়।
শবনমকে কাজ থেকে ফেরার পথে গুরুগ্রাম পুলিশ আটক করে। পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় সে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। তাঁর মালকিন এসে পুলিশকে জানান বহুদিন থেকে শবনম তাঁর বাড়িতে কাজ করে। তারপর তাঁকে পুলিশ ছেড়ে দেয়। ঘটনার দু’দিন পর শবনম গ্রামে ফিরে যায়।
বিউটি খাতুন গুরুগ্রামে কাজ করতেন। তিনি বলেন - “এই হেনস্থা কোভিডের থেকেও ভয়ংকর,” অন্য রাজ্যে কাজ করতে এসে বিপদে পড়লে আমরা কার কাছে যাব? পুলিশ? প্রশাসন? ওরাই তো আমাদের হয়রানি করছে।”
ভারতে নারী শ্রমিকরা যে গৃহস্থালি কাজ করেন সেটি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ!
ক) অনেক সময় একে “শ্রম” বলেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, বরং “সাহায্য” হিসাবে দেখা হয়। আনুমানিক ২ থেকে ৯ কোটি নারী এই খাতে কাজ করলেও, কোনও সামাজিক সুরক্ষা নেই, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় না। এই কাজ হয় ব্যক্তিগত বাড়ির ভেতরে—যেখানে কোনও নজরদারি নেই, এবং আইনি সুরক্ষার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পর্কই বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
খ) উইমেন ইন ইনফরমাল এমপ্লয়মেন্ট: গ্লোবালাইজিং অ্যান্ড অর্গানাইজিং (WIEGO)-এর ভারতীয় প্রতিনিধি শালিনী সিনহা বলেন,
“একদিকে বাড়ি হলো কাজের জায়গা—কিন্তু একই সঙ্গে সেটি একটি ব্যক্তিগত পরিসর, স্বীকৃত কর্মক্ষেত্র নয়। ফলে সেখানে যা কিছু করা হয়, তা শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। শ্রম সম্পর্ক ও শালীন কাজের প্রশ্নগুলো পেছনে পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, এটি নারীদের সেবামূলক কাজ—যা এখন অর্থনৈতিক ও পারিশ্রমিকভিত্তিক হয়ে উঠেছে—এ কারণেও এর মূল্য কমে যায়।”
গ) তিনি এই ব্যবস্থাকে প্রায় “সামন্ততান্ত্রিক” বলে বর্ণনা করেন—
“আপনি তো আমাদের পরিবারেরই একজন, তাই আরেকটা কাজ করে দিন। হ্যাঁ, আমরা আপনাকে টাকা দিই, কিন্তু কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই।”
কিছু শ্রমিক তাঁদের নিয়োগকর্তার বাড়িতেই থাকেন; অন্যরা দিনে একাধিক বাড়িতে কাজ করেন। যে কোনও ক্ষেত্রেই, সিনহার মতে, “এই কাজের কাঠামোই শ্রমিকদের অধিকাংশ বিদ্যমান শ্রম আইনের বাইরে রেখে দেয়।”
বর্তমান আটক অভিযান এই অসুরক্ষাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। নারী
শ্রমিকরা তাঁদের দুর্দিনে সময়মতো মজুরি চেয়েছিলেন, বা বাড়ি ফেরার টিকিট কাটার জন্য আগাম কিছু টাকা। অনেকেই বছরের পর বছর—কেউ কেউ পাঁচ বছর পর্যন্ত—একই বাড়িতে কাজ করেছেন, তবু ন্যূনতম সুরক্ষাও তাঁরা পাননি, কিংবা সংকটের সময় তাঁদের নিয়োগকর্তা পাশে দাঁড়াবেন কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
সিনহা উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের পক্ষে দাঁড়াতে নিয়োগকর্তাদের দ্বিধার একটি কারণ হলো কাজের প্রকৃতি, এখানে নিয়োগকর্তা কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নয়, একটি পরিবার। এমন ক্ষেত্রে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা অনেক সহজ হয়ে যায়। ফলে যে সহায়তা আসে, তা অধিকারের ভিত্তিতে নয়—দয়া বা অনুকম্পার ফল হিসেবে! ( তথ্যসূত্র- behanbox.com, August 22, 2025)
আমাদের আলোচনায় একটু আগে দেখেছি ভারতে বাঙালি মুসলিমরা দ্বিগুণ নির্যাতিত কীভাবে হচ্ছেন। এখানে প্রাবন্ধিকের সুরে, সুর মিলিয়ে বলতে হচ্ছে ,আমাদের মহান দেশে বাঙালি মুসলিম নারীরা ত্রিগুণ নির্যাতিত একবার মুসলমান হবার দোষে, আরেকবার বাঙালি হবার কারণে, আরও একবার নারী বিদ্বেষীদের আস্ফালনে! আমরা সত্যিই জানিনা এই নোংরামির শেষ কোথায়! এই যে পুরো এনসিআর দিল্লি জুড়ে বাঙালি বিদ্বেষের ঘেন্না দাবানলের মতো ছড়িয়ে, অকারণে শারীরিক হেনস্থা করে, কিছু মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে, তাঁদের স্বপ্নকে দুমড়ে- মুচড়ে পিষে দেওয়া হয়েছে, এর দায়ভার কে নেবে?
এদিকে বাঙালি মুসলিম নারীদের, ‘চণ্ডালিনীর ঝি’ মনে করতে থাকা গোষ্ঠীকে আমরা একবার মনে করিয়ে দিতে চাই, বাঙালি মুসলিম নারীরা স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
রিজিয়া খাতুন, বাংলার প্রথম মুসলিম নারী, যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, শাস্তিস্বরূপ কালাপানি হয়েছিল। লেখক ও গবেষক শ্রীমতী শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন –মেয়েরা জেলায় জেলায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মিটিং মিছিলের মধ্যে নিজেদের সবটুকু দিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে।(তথ্যসূত্র -voabangla.com,১৯ আগস্ট,২০২৩)
যশোর জেলার দৌলতউন্নেষা বারো বছর বয়স থেকেই বঙ্গশ্রী, দেশ, বিচিত্রা প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতেন। তিনি ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। সেইসময় মুসলিম মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে বিধি নিষেধ ছিল। কিন্তু দৌলতউন্নিসার উদার বাবা- মা এবং স্বামী তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। শ্বশুরবাড়িতেও তিনি পড়াশোনা করতেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যে তাঁর বিশেষ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পরশপাথর”(১৯৫৭)। এই দৌলতউন্নেসা চোদ্দো বছর বয়সে ১৯৩২ এ আইন অমান্য আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। ‘গাইবান্ধা মহিলা সমিতি’র সম্পাদক হয়েছিলেন অতি অল্প বয়সে। তাঁর বক্তৃতার টানে সভায় সাত-আটটি গ্রামের মুসলিম মেয়েরা উপস্থিত হতো। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে পুলিশ তাঁদের বসতবাড়ি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, পরিবারকে গাইবান্ধা থেকে বের করে একপ্রকার রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছিল । তবু আন্দোলন থামেনি। আন্দোলন জোরদার করতে সভার পর সভা করেছিলেন। ফুলছড়ি গ্রামের একটি সভা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল তাঁকে। তাঁকে রাজশাহী, প্রেসিডেন্সি, বহরমপুর জেলে রাখা হয়েছিল। মুক্তি পাওয়ার পরও গোপনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।
ঢাকার বিক্রমপুরের ফুলবাহার বিবি ছোটবেলায় বাবা মা হারিয়ে বড় হয়েছিলেন বড়ভাই তমিজুদ্দীনের কাছে। তমিজুদ্দীন জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং আইন অমান্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯২৯ এ গ্রেফতার হয়েছিলেন, কিছুদিন কারবাসও করেছিলেন। বড় ভায়ের কাছ থেকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের দীক্ষা নিয়েছিলেন। তার পরেই শুরু হয়েছিল তাঁর অভিযান। পাইকপাড়ার কিরণ রূদ্রের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে গ্রেফতার হলে ছ মাসের জেল হয়েছিল তাঁর। তাঁকেও ঢাকা ও বহরমপুর জেলে রাখা হয়েছিল। জেল থেকে বেরিয়ে এসে কংগ্রেসের গঠনমূলক কাজে যোগ দিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের রাজিয়া খাতুন ও হালিমা খাতুন ছোটবেলা থেকে দেশের কাজ করতে উৎসাহী ছিলেন। ১৯৩০-৩২ নাগাদ ময়মনসিংহের যুগান্তর দলে যোগ দিয়েছিলেন। পরে যুগান্তর দলের সঙ্গে তারাও জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪২ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। (তথ্যসূত্র-স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারীরা, othervoice.in, ৭ সেপ্টেম্বর,২০২১)
মুসলিম জেনোফোবিক ঝাণ্ডা নিয়ে, কারা যেনো ঐ, করে হৈচৈ! গুরুগ্রামের নারী শ্রমিক ছবি বিবি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া একটা ইন্টারভিউতে জানান, একদিন দুপরে কাজ থেকে ফিরে তিনি ও তাঁর স্বামী জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। সেইসময় পুলিশ এসে তাঁর স্বামীকে তুলে নিয়ে যান। তারপর থেকে সে এক সপ্তাহ ধরে ডিটেনশন ক্যাম্পে স্বামীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তিনি ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় জানতে চান- আমরা গরীব, আমরা বাংলায় কথা বলি, তাই আমরা বাংলাদেশি? আমরা বাংলায় কথা বলতে পারবো না?
আপনাদের মাপদণ্ডের হিসাবে ক্লাসলেসের তালিকা ভুক্ত শ্রেণিকে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিতে একবার বৈষম্যের ডুগডুগি বাজিয়ে, আরেকবার, বানর নাচ দেখিয়ে, আয় হনুমান কলা খাবি লোভ দেখিয়ে ; নিজেদের আখের গুছিয়ে, তল্পিতল্পা গুটিয়ে, প্রতিবাদী মন নিয়ে সটান উলটপুরাণ ঘটিয়ে ‘মার দিয়া কিল্লা ফতে’ ভাব দেখিয়ে, বিজয়ের হাসি হেসে অপদার্থ সম্প্রদায়ের অকর্মণ্যতা নিয়ে রসিকতা করতে করতে দিনরাত্রি কাটতে থাকুক!
0 Comments
Post Comment