ভারতীয় নারীর অধিকার-অর্জনের আন্দোলন – জারি থাকে ‘পূজা’দের প্রতিরোধ

  • 13 May, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 106 view(s)
  • লিখেছেন : অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
 মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আত্মবিস্মৃত হই। এর বিপরীতে নেতাদের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আমরা অযৌক্তিক রকমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। এরই সুযোগে একদিকে আমরা যেমন নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন, শত্রুর বিপরীতে নিজেদের আরও অসহায় করে তুলি – একইরকমে ধূর্ত নেতারা নিজেদের ক্ষমতার মিথ্যাগর্বে বলীয়ান হয়ে উঠে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে। সমস্ত ব্যবস্থাটা ধূলিসাৎ হয় যখন, নিজেদের গুছিয়ে নিতে না পারা আমরা – চোখ মেলে দেখি এক রাজার বদলে আরেক রাজার রাজপাট কায়েম হয়েছে।

“রাজা আসে যায়

রাজা বদলায়

নীল জামা গায়

লাল জামা গায়

এই রাজা আসে

ওই রাজা যায়

জামা কাপড়ের রং বদলায়...” লিখেছিলেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কালোত্তীর্ণ এই উচ্চারণ।

 

মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আত্মবিস্মৃত হই। এর বিপরীতে নেতাদের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আমরা অযৌক্তিক রকমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। এরই সুযোগে একদিকে আমরা যেমন নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন, শত্রুর বিপরীতে নিজেদের আরও অসহায় করে তুলি – একইরকমে ধূর্ত নেতারা নিজেদের ক্ষমতার মিথ্যাগর্বে বলীয়ান হয়ে উঠে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে। সমস্ত ব্যবস্থাটা ধূলিসাৎ হয় যখন, নিজেদের গুছিয়ে নিতে না পারা আমরা – চোখ মেলে দেখি এক রাজার বদলে আরেক রাজার রাজপাট কায়েম হয়েছে। সর্বাগ্রে তাই আত্মশক্তিকেই, সঠিক মানদণ্ডে নিখুঁত রকমে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

 

আজকের আলোচনায় তাই সচেতন সিদ্ধান্তে ইতিহাসকে বর্জন করেছি। অন্ধকার বর্তমানে দাঁড়িয়ে অকারণ অতীত-রোমন্থন যে চিরকাল সাহস জোগাবে, এমনটা নাও হতে পারে। এর বিপরীতে, সংকটদীর্ণ সমকালেও মানুষের মুখ, মিছিলের একেকটি মুখ যে অজস্র অবয়বহীন দেহের মিছিল থেকেও আলাদা করে সামনে বেরিয়ে এসে উজ্জ্বলরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠতে পারে, তেমন একেকটি উদাহরণ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা জরুরী। আমাদের আজকের আলোচনায় তাই উঠে আসবে রাজস্থানের পূজা মেঘওয়াল ও উত্তরপ্রদেশের কমরেড পূজা কাজানা’র নাম। জ্যোতিবা ফুলে, বিমলা দাং, সরোজিনী নাইডু অথবা মণিকুন্তলা সেনের যে ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এদেশের মানুষ এখনও বহন করে নিয়ে চলেছেন।

 

২৯ এপ্রিল ২০২৬ – পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের দিন। একই দিনে, রাজস্থানের উদয়পুরে জনৈকা পূজা মেঘওয়াল, তাঁর বিবাহ শোভাযাত্রার অঙ্গ হিসেবে একটি সাদা ঘোড়ায় চেপে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বেরিয়েছিলেন। দলিত পূজা মেঘওয়ালের এহেন দুঃসাহস গ্রামবাসীদের একাংশ ভালো চোখে দেখেননি। কাজেই কিছুদূর না যেতেই এলাকার বেশ কয়েকজন সেই শোভাযাত্রার উপরে চড়াও হন। ধস্তাধস্তির ফলে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই আহত হন। পূজাও ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সেদিনের মতো বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন। এখানেই সবটুকু শেষ হতে পারত। কিন্তু বরাবর মানুষই যে নতুন করে ইতিহাস রচনা করে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। মানবদেবতা রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই সেই বিশ্বাসের কথা, তাঁর রচনায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

 

তাই, ৭ মে ২০২৬ – একই ভাবে ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হয়ে বধূবেশে পূজা রাস্তায় নামেন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি ও ভীম আর্মির প্রত্যক্ষ সমর্থনে, নিজগোষ্ঠীর শয়ে-শয়ে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল করে পূজা মেঘওয়াল উদয়পুরের জেলাশাসকের দফতরে পৌঁছন। তাঁর হাতে ছিল আচার্য বিনোবা ভাবে ও জ্যোতিবা ফুলের রঙিন প্রতিকৃতি। জেলাশাসকের মাধ্যমে তিনি রাজ্যপালের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি স্মারকলিপি জমা দেন। সেই স্মারকলিপিতে তিনি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ উল্লেখ করে দোষীদের যথাযথ শাস্তির দাবি জানান। স্পষ্ট ভাষায় সেই স্মারকলিপিতে পূজা লিখেছেন, অন্তত এক ডজন মানুষ তাঁর উপরে ২৯ তারিখের হামলায় সরাসরি জড়িত থাকলেও, সেই দিন (৭ মে) অবধি মাত্র চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলে, পূজা এই ঘটনার তদন্তভার অন্য কোনো পুলিশ আধিকারিকের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ভীম আর্মি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির তরফেও, পূজার এই দাবিগুলির প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছে।

 

দেশব্যাপী বর্ণহিন্দু আগ্রাসন ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার শিখরে বসে থাকা শাসকগোষ্ঠীর যে আস্ফালন আমরা বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে প্রত্যক্ষ করেছি ও করেই চলেছি, তেমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে পূজা মেঘওয়ালের মতো একেকজন, ও তাঁদের এহেন একেকটি দুঃসাহস, আমাদের বিস্মিত করে। তাঁদের সাহস ও প্রত্যয়কে তখন অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমাদের এখন জোটবদ্ধ হওয়া জরুরী।

 

অন্যদিকে একই দিনে আমাদের কাছে পূজা কাজানা’রও খবর এসে পৌঁছয়। তথ্য বলছে, কমরেড পূজা কাজানা – সদস্য, অল ইণ্ডিয়া ফরোয়ার্ড ব্লক, তিনি সংখ্যালঘু মুসলিম পরিবারের সদস্য ও একজন কমিউনিস্ট – কমরেড কাজানা গত ৭ মে, উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার কাটরা পৌরসভার চেয়ারপার্সন পদে মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। যাঁরা এতকাল মহিলা জনসংখ্যাকে, সংখ্যালঘু জনতাকে – নিছকই ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন, এই ফলাফল হয়তো তাঁদেরই মুখের উপরে এক সপাট চপেটাঘাত।

 

নারী, দলিত, সংখ্যালঘু – এমন প্রত্যেক পরিচয়ের আড়ালে কেবলই মাথা নত করা, এমন প্রত্যেক ‘প্রাথমিক’ পরিচয়ে ‘নিছকই শামিল’ হতে গিয়ে, অজান্তেই সামাজিক পরিসরে ক্রমশ আরও প্রান্তিক হয়ে যাওয়া – আদতে বহুত্ববাদ-বিরোধী রাজনীতিরই হাত শক্ত করে। এই সমস্ত পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েই নিজেদের উদ্যোগে, নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতিরও বাইরে নিয়ে আসাটা, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। অধিকার কেড়ে নেওয়া প্রয়োজন, বুঝে নেওয়া প্রয়োজন কেবল দলিত অথবা সংখ্যালঘু পরিচয় প্রতিষ্ঠার কারণেই নয় – দলিতের চেয়েও বড় নিজেদের মানুষ-পরিচয়কে অর্জনের প্রয়োজনেই।

 

দলিত অথবা সংখ্যালঘু পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ – যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধতার জন্য, মানুষের পরিচয় প্রয়োজন সেই অন্যায়ের প্রতিকার দাবি করে আধুনিক পৃথিবীতে উপযুক্ত, আধুনিক এক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। তাই একই সঙ্গে দলিত অথবা সংখ্যালঘু চরিত্রকে সামনে রেখেই এসময়ে আন্দোলন কাম্য, কিন্তু সেই আন্দোলন অনুদান-ভিক্ষার আন্দোলন নয়, অধিকার-অর্জনের আন্দোলন হয়ে ওঠা জরুরী। পূজা মেঘওয়াল অথবা পূজা কাজানার লড়াই অধিকার অর্জনের কথা বলে। ভোটব্যাঙ্ক হয়ে বেঁচে থেকে অনুদান-ভিক্ষার চরিত্র তাঁদের আন্দোলনের নয়। যতই মেয়েরা বুক ঠুকে এগিয়ে এসে নিজেদের মুখে নিজেদের কথা বলবে, নারীমুক্তির আন্দোলন ততই অগ্রসর হবে। যতদিন তারা নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেবে ততই তারা ভোটব্যাঙ্কের ফুটবল হয়ে এদল-ওদলের পেনাল্টি বক্সে ঘুরপাক খেয়ে মরবে। নিজেদের অধিকার হাত পেতে চাওয়া নয়, শিরদাঁড়া সোজা রেখে দাবি করা জরুরী – এই বোধ আজ সকল অনগ্রসর শ্রেণীর মননে জাগ্রত হোক। তারা যেন এর পরবর্তীতে অধিকার কেড়ে নিতে, অধিকার বুঝে নিতেই ক্রমশ সচেষ্ট হয়।

 

লেখক: বিজ্ঞানী, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

ছবি: সংগৃহীত

0 Comments

Post Comment