- 21 March, 2026
- 0 Comment(s)
- 48 view(s)
- লিখেছেন : মৌসুমী দাস
না আজ আর দেরি করলে চলবে না। সকাল সকাল বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে সুতপা, আজ তার কলেজের প্রথম দিন। “সুতপা........, সুতপা.......” ব্যাস মায়ের ডাক পড়ে গেছে, “হ্যাঁ মা....... আমি উঠে পড়েছি, রেডি হচ্ছি”। আজ মনে মনে ভীষণ একটা উত্তেজনা। যাক শেষ মেশ খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে ছুটলো চৌরাস্তার মোড়ে, ওখান থেকেই যে ৯.৩০ সকালের বাস টা ছাড়বে, women's college.
খুব একটা বাসে যাবার অভিজ্ঞতা নেয়। মাঝে মাঝে কোন একটা বেড়ানোর জায়গায় যাবার জন্য বাসে উঠেছে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয়নি, বাসে উঠে পড়ে সুতপা, অফিস টাইম, কলেজ টাইম বড্ড বেশি যেন ভিড়।
যাক ভালো মন্দ অভিজ্ঞতা নিয়ে বাস থেকে নেমে কলেজের ভিতর প্রবেশ করলো। Room খুজঁতে অন্যদের সাহায্য নিতে হলো। “হাই....... ,” একটি মিষ্টি হাসিখুশি ভরা মেয়ে এগিয়ে এসে বন্ধুতের হাত বাড়িয়ে দিলো, সুতপার ও একনজরে তাকে ভালো লাগলো, সে ও হাত বাড়িয়ে দিলো, জানলো তার নাম ‘মিতা’। প্রথম দিন থেকেই মিতার সাথে শুধু বন্ধুত্বই নয় ‘সাবজেক্ট’ গুলিও একই......, সু তপার ভালোই লাগলো.......,
সুতপা পড়াশুনা ছাড়া গল্পের বই ভালোবাসে, আর সে শান্ত প্রকৃতির, কারো মুখের উপর জোর করে কিছু বলা বা অন্যায় দেখে বিদ্রোহী হয়ে ওঠা ও অতটা পারে না, কারণ প্রথম দিন বাসের মধ্যের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হয়ে ওঠেনি।
বেশ কিছুদিন টানা কলেজ গিয়ে মিতা ছাড়া বেশ আরো কয়েক জনের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, কিন্তু প্রাণোচ্ছল ছটপট প্রতিবাদী মিতার সাথে সুতপার একটা আলাদা গাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, সুতপার মনের সব কথা একমাত্র এই বান্ধবীকে যেন বলা যায়। বেশি দিন বন্ধুত্ব নয় তবু সুতপার যেন মনের মতো, যেন কতদিনের পরিচিত।
সুতপা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে... মা বলে ওঠে আজ কেমন হলো ক্লাস, মুখটা ওইরকম শুকনো কেনো রে? টিফিনটা আবার ফিরিয়ে আনিস নি তো?" সুতপার উত্তর দিতে ভালো লাগছে না, তার যেন গা ঘিন্ ঘিন্ করছে। সে কলেজের ব্যাগ খাটের উপর একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। সেখানে সে তার বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদগুলোকে কলের জল খুলে দিয়ে চাপা দিতে ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। সে ভেবে উঠতে পারে না কিভাবে নিত্যদিনের এই মানসিক যন্ত্রণা মেনে নিয়ে চলবে,---- নাঃ --- নাঃ --- মা সমানে ঢেকে চলেছে,---- সুতপা----- সুতপা ---- কি হলো রে ------?----- বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে ---- বলে," এই তো যাই মা।" বাড়িতে এই মানসিক যন্ত্রণার কথা বলা যাবে না, বিশেষ করে মাকে --- টেনশন দিয়ে কোনো সমাধান হবে না --, মনে জোর আনলো --নাঃ --- শক্ত হতে হবে, মিতাকে সব জানাতে হবে --, একটা সমাধান করতেই হবে।
যাইহোক্ , পরের দিনটা ছিলো শুক্রবার - সে ঠিক করলো মিতাকে আসার পথে বাসে (সুতপার) তার বাড়ি নিয়ে আসবে - তাই ফোন করে সে মিতাকে বাড়িতে জানিয়ে আসতে বললো - যে কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হবে বাড়ি যেতে, যেন বাড়িতে বলে আসে, শনিবার সেরকম কলেজে ক্লাস থাকে না --- তাই সুতপা কলেজ যাবে না।
কলেজ গিয়ে সুতপা প্রথমেই মিতাকে নিয়ে কলেজের কমন রুমে নিয়ে গেলো, তাকে সমস্ত মানসিক ও শারীরিক কিভাবে নিত্য কলেজ থেকে বাসে করে বাড়ি ফেরার সময় এক মাঝ বয়সী লোক দ্বারা নিপীড়িত হতে হয় তা জানালো, মিতা বেঞ্চ থেকে তড়াক করে উঠে পড়ে --। অবাক হয়ে তার দিকে চেঁচিয়ে বলে ওঠে বলিস কি তুই, কোন প্রতিবাদ করিসনি? মুখ বুজে সহ্য করছিস এতদিন ধরে। বাসের এত লোক, তাদের হাতে চিৎকার করে তুলে দিস নি কেন? নাঃ- তোকে দিয়ে হবে না.. আজই ঐ লোকটার একদিন কি আমার একদিন --- একবার আমায় দেখা--- তো-- দেখ কি হাল করি! সুতপা ভয়ে আৎকে ওঠে-- বলে কি মিতা -- কি করবে? ওর সাথে মারপিট --, না-- না-- না -- শোন মিতা একটু ভয় টয় দেখাস পুলিশ টুলিশের, যাতে শিক্ষা হয়, মারপিট করতে যাস্ না। কি করতে কি হবে -- বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেলে মা আবার টেনশন্ করে শেষে কলেজ না বন্ধ করে দেয়। মিতা এক ধমক দিয়ে বলে ওঠে -- চুপ করতো, এই তোদের মতো মেয়েদের জন্যই না এরা ছাড় পেয়ে যায়, তুই দেখবি আমি কি করি।" তুই সামনে থাকবি, আমি পিছনে থাকবো -- বন্ধু -- নো টেনশন্ -Ok"! যথারীতি কলেজ শেষ করে সুতপা দুরু দুরু বুকে বাস স্টপে গেলো- সঙ্গে বান্ধবী মিতা। বাস আসতেই দুজনে উঠে বসলো - সুতপার দুটো সিট পিছনে মিতা --, তৃতীয় স্টপেজে রোজ সেই মাঝবয়সী লোকটি ওঠে, যেন সুতপাকে ভালোই পেয়েছে, কিছু বলতে পারে না, শুধু হয় সিট ছেড়ে ভিড়ে সরে যায়, কিন্ত সুতপা কিছুতেই সেই লোকটির নোংরা কদর্য হাতের ছোঁয়া থেকে রেহাই পায় না। আশে পাশের কোন লোক কি বুঝতে পারে না কিছু? নাকি সুতপা প্রতিবাদ না করায় তারা কিছু বলতে এগিয়ে আসে না? সুতপা যে ভীরু মনের মানুষ। কত রকম ভাবে সে। এই নিয়ে বলতে গিয়ে চেঁচামেচি ঝামেলায় পড়ে, শেষে যদি আবার পুলিশ টুলিশ এর ঝামেলা হয়, পাড়ায় উল্টো পাল্টা কে কি বলবে --, বাবা-মা যদি সুতপার কলেজ পড়া সব বন্ধ করে দেয়!
-- এই ভাবতে ভাবতে তৃতীয় স্টপেজ আসতেই লোকটি উঠে পড়ে চোখ দুটি যেন সুতপাকেই খুঁজছে, বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটতে শুরু করে। একবার মিতার দিকে তাকায় -- মিতা ঈশারা করে আমি আছি। আজ এত ভিড় --- লোকটি ভিড় ঠেলে ঠিক তার সিটের পেছনে এসে দাঁড়ায়, ভিড়ের মধ্যে ঠিক সেই হাত দুটি প্রথমে তার পেটের কাছে,-- এক ঝটকায় সরাতেই খানিক পরে সেই হাত চলে আসে পেটের আরও কিছু উপরে ---- না সুতপা আর পারছে না -- কই মিতা --' মিতা কোথায় তুই,' মনের ভিতরেই ডাক চাপা পড়ে, শব্দ আর বাইরে আসে না, দুটো চোখ লজ্জা অপমানে ঝাপসা হয়ে আসে,
দ্রুত বাসের দরজার কাছে গিয়ে বাস থামাতে বলে - নেমে পড়ে সুতপা, উদভ্রান্তের মতো একটা অটো রিক্সা ডেকে বাকি বাড়ির রাস্তাটা চলে আসে, মিতাকে দেখার আর কোন চেষ্টা করে না।
রাতটা কিভাবে তার কেটেছে অর্ধঘুমে সেই শুধু জানে, সমস্ত ঘোর কাটতেই মিতার কথা মনে আসে, মেয়েটা গেলো কোথায়? গেলো কোথায় তার প্রতিবাদী রূপ? কোন ফোন তো করলো না! বাড়ি ফিরে চলে গেছে ---, আমাকে ঐ লোকটার হাত থেকে যে বাঁচানোর কথা ছিলো -----! মিতাকে ফোন করবো, এই সব ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের বারন্দায় মোবাইলটা হাতে করে বেরিয়ে আসে।
মোবাইলটা হাতে করে দাঁড়িয়ে নানা কথা ভাবছিলো। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে -- মিতা নাকি, না -- এতো বান্ধবী অন্তরা --! অন্তরা এখন ফোন করছে কি ব্যাপার! দেখি --" হ্যালো' অন্তরা" -" বল্ -- কি বলছিস --!" " কোথায় যাবো--?"" মিতার বাড়িতে, কেন রে --?" "আচ্ছা আচ্ছা -- বেশ্ বেশ্ যাচ্ছি --, তুই মিতার বাড়িতে কেন রে?" “গেলেই জানতে পারবো --", মাথা কাজ করছে না -- কি হলো, মিতার কোন এক্সিডেন্ট --- না -- না -- এইসব কি ভাবছি। আর দেরি না করে যাই মিতার বাড়ি--, এই বাড়ি থেকে দুটো স্টপেজ। নানা রকম ভাবনা চিন্তা মাথায় ঘুরছে, বাসের সেই পরিস্থিতি -- মাথায় মনে আসলেই গোটা শরীর দিয়ে গরম হাওয়া যেন বেরিয়ে আসছে, যেখানে মিতা আমাকে বলছিলো লোকটাকে একটা উচিত শিক্ষা দেবে সেদিন----, কিন্তু কি হলো মিতার কোন ভূমিকা দেখতে পেলাম না, বাস থেকে নেমে মিতার কোন দেখাই পেলাম না। সেদিন এর কথা চিন্তা করতে করতে মিতার বাড়ির সামনে চলে এসেছি, এত ভিড় কেন মিতার বাড়ির সামনে? কি হলো? আমি তাড়াতাড়ি ভিড় সরিয়ে এগোতেই অন্তরা, বৈশাখী বান্ধবীরা বললো -- এসেছিস সুতপা, দেখ্ মিতা কি করলো," কি করেছে রে --?" আমি কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করে এগিয়ে যেতেই দেখি, বাসের সেই লোকটা মিতাকে জড়িয়ে ধরে কাদঁছে," কেন এমন করলি রে মা --" মাতৃহারা মিতা, ছোটোতেই ওর মা মারা গেছে, মিতার দেহটা মাটিতে শোয়ানো, সুইসাইড করেছে গলায় দড়ি দিয়ে ---! বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো লোকটিকে দেখে -- আমার হাত পা হিম হয়ে গেলো, সামনে যাবার আর ইচ্ছে নেই, ইচ্ছে নেই ঐ ভদ্রলোকের মুখোশ পরা লোকটার মুখোমুখি হয়ে তার মুখোশ খোলার --, আমার বোঝার বাকি রইল না কেন মিতা সবার থেকে বিদায় নিল,--- যেমন একরাশ এলোমেলো চিন্তা ভাবতে ভাবতে ছুটে এসেছিলাম, তেমনি নির্বাক নিঃশব্দে এক পা এক পা করে পিছুতে পিছুতে ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসি। গভীর একটা দম ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। ভাবতে থাকি কেন একটা প্রতিবাদী মেয়ে হয়ে মিতা নিজেই সরে গেলো। পারলো না কেন প্রতিবাদ করতে --, সমাজের প্রতিবাদী মুখ হয়ে উঠতে!!
0 Comments
Post Comment