- 06 April, 2026
- 0 Comment(s)
- 150 view(s)
- লিখেছেন : অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
যতদিনে এ লেখা মানুষের কাছে পৌঁছবে, আশা করব ততদিনে অল্ট নিউজে প্রকাশিত নিবন্ধটিও (https://www.altnews.in/bengal-sir-the-wall-eci-built-around-electoral-data-and-how-we-broke-through-it/) অনেক মানুষ পড়ে ফেলবেন। অনেক মানুষের কাছে সেই তথ্য পৌঁছবে। ভাবনার বিষয় হল, আদৌ তা আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে তো? এই প্রশ্নের উত্তর আশাব্যঞ্জক নয় একেবারেই।
বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া চালু হওয়ার সময় থেকেই যে বিষয়টা আমাদের মতো অনেককে ভাবিয়েছে, তা হল জনগণের সামগ্রিক উদাসীনতা, এক অদ্ভুৎ উদাসীন মনোভাব। বিহার-পরবর্তীতেও এই নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের উপর এমন শিশুসুলভ আস্থা রেখে চলা, ও তারই সঙ্গে ক্রমশ নিজের সযত্নলালিত সাম্প্রদায়িক মনোভাবটিকে ধীরবৎ প্রকাশ্যে নিয়ে আসা। “সমস্যাটা তো ওদের, কাগজ তো ওদেরই নেই!” এই তাচ্ছিল্য আর ঘৃণার উদযাপনটুকুই এখন স্বাভাবিক ও প্রকট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে, মধ্যবিত্ত বাঙালির সাম্প্রদায়িক মনোভাব বহু দশক যাবৎ ফুলে-ফলে বিকশিত হয়েছে। দীর্ঘ ‘বাম’শাসনেও সেই ‘মধ্যমেধা’র তেমন একটা উন্নতি হয়নি। জ্যোতি বাবুর মাথা ভেঙে দেওয়ার হুমকি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য – কিন্তু গড়পড়তা হিন্দু বাঙালি চাকুরিজীবি পরিবার মুসলমানদের প্রতি প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষ নিয়েই চলতেন। বিজেপি ও সম্প্রতি ‘নরম হিন্দুত্ব রাজনীতি’র দোসর তৃণমূলেরও ভোট-রাজনীতির বাড়বাড়ন্তের কারণে, আজ সেই বিদ্বেষ প্রকাশ্যে আনতেও, তাঁরা আর বিচলিত বোধ করছেন না। সেযুগ আর এযুগের তফাৎ এইটুকুই।
এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে সংসদীয় বামদলগুলির একাংশও যে বিজেপি-সরকারের অধীনে ‘ভালো এসআইআর’এর আশা করেছিলেন, এতেও বোধহয় আশ্চর্য হওয়া বারণ। এমনকি নির্বাচনী প্রচারেও, এখনও অবধি কোনো কোনো বামদলের তরফে দেখছি, “সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে নাম উঠে যাবে”, “ভয় পাবেন না”, “ফর্ম-৬ ভরুন,” এধরনের স্তোকবাক্যের ফুলঝুরি। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস অন্তত “এসআইআর বিষয়টি বৈধ ভোটারকে হেনস্থা করার লক্ষ্যে বিজেপির ষড়যন্ত্র”, এধরনের আক্রমণ ভোট প্রচারে তুলে আনছে। যদিও তা যথেষ্ট নয়, পরিস্থিতি সরাসরি সাম্প্রদায়িক উসকানির দিকেই এগোচ্ছে, এবং সেই লক্ষ্যেই বিজেপি ও কমিশনের এই যৌথ কৌশল, বিষয়টি আর ওয়াকিবহাল কারও কাছেই অস্পষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে এই এসআইআর’এর মাধ্যমেই যে এনআরসি ও তার মাধ্যমে সংখ্যালঘু জনগণকে বেনাগরিক করার প্রক্রিয়া চালু হবে, সেই আশঙ্কা আজ আর অমূলক নয়।
প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু মানুষেরাই এই তুঘলকি এসআইআর’এর কারণে সবচেয়ে বেশি হেনস্থায় পড়েছেন। ‘কাগজ’ বিষয়টা প্রান্তিক মানুষের কাছে যে কতখানি বিলাসিতার বিষয়, শহুরে ‘মধ্য’জীবীদের যে সেই বিষয়ে কোনো সম্যক ধারণাই নেই, তা তাদের একেকজনের ‘সামাজিক’ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিষ্কার। এর পরেও আসছে লিঙ্গের প্রশ্ন। মুসলিম সমাজের নারীর অবস্থান নিয়ে এমন ‘মধ্য’জীবীরা অনেক সময়েই বিশদ আলোচনা করে থাকেন। তাঁদের কাছেই আমার প্রশ্ন থাকবে, এহেন পক্ষপাতদুষ্ট এক রাষ্ট্রের অধীনে এমন এক তুঘলকি প্রক্রিয়ায় সেই সমাজের মেয়েরা কতখানি সুরক্ষিত বলে আপনার মনে করেন? [বিষয়টির গম্ভীরতা সম্পর্কে আমারও মন্তব্য করার বোধহয় কোনো অধিকার নেই।]
‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র নামে, চূড়ান্ত রকমে ব্যর্থ প্রযুক্তির ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন লাখে লাখে ভোটারকে যে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার প্রতিকারে বিজেপি-বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির এককাট্টা অবস্থানে আসা প্রয়োজন ছিল, তার সামান্যতম ইঙ্গিত মিলছে না। এমন এক অবস্থায়, আমরা বরং খুব ক্লিশে ভাবে হলেও, মেয়েদের বাস্তব সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করি চলুন।
১) বিবাহিতা নারীদের পদবি পরিবর্তন।
২) বিবাহিতা ও অত্যাচারিতা নারীরা, যাঁরা বিবিধ কারণে বিবাহিত-সংসার ত্যাগ করে, আবারও নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন, আসতে বাধ্য হয়েছেন, কাগজ তাঁদের কাছ অবধি পৌঁছয়নি।
৩) উত্তরাধিকার-সূত্রে অনেক সময়েই, নানা কারণে যাঁরা পৈতৃক-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত, জমি-বাড়ির দলিল তাঁরা কোত্থেকে পাবেন?
এরই সঙ্গে এবারে যোগ করুন, এমন সংখ্যালঘু নারীদের অবস্থান। মুসলিম-ধর্মে বিধবা নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বৈধব্যের পর আরও একবার তাঁরা পদবি পরিবর্তন করেন। ‘বিবি’ থেকে তাঁরা অনেকেই ‘বেওয়া’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন। এই পরিবর্তনের বিষয়টিও কমিশনের তরফে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সর্বোপরি এই সমস্ত সংকটের পরবর্তীতেও কমিশনের তরফে দেখা গেছে এক চূড়ান্ত উন্নাসিকতা, ও তার পাশাপাশি, সময় ও পরিকাঠামোর বিষয়টিকে এতটুকু ধর্তব্যে না এনে এক অদ্ভুৎ তাড়াহুড়ো ও তারই পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শাসকদলের তরফে প্রকট এক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে বিষয়টিকে কোনো মতে সেরে ফেলার মানসিকতা। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, এমন নজিরবিহীন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও, না কোনো সংসদীয় রাজনৈতিক দল, না বৃহত্তর সুশীল সমাজ – এখনও সম্যকরূপে বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করতে পেরেছেন। বিশেষ করে ‘রাজনীতি-সচেতন’ বাঙালী সমাজের এহেন বোধের দৈন্যতা বড় নিরাশার জন্ম দেয়।
মাননীয় বিচারপতি সরাসরি মন্তব্য করছেন, “এবারে ভোট দিতে না পারলেই ভোটাধিকার চলে গেল, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই!” – আইনের দিক থেকে তিনি নির্ভুল হলেও, তিনি কি বিষয়টির সামাজিক ও গণতান্ত্রিক গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন? আইনের দীর্ঘসূত্রিতায় একজন সাধারণ মানুষকে যে ঠিক কত ধরনের অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়, কতখানি মানসিক ও আর্থিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেই বিষয়ে তিনি কি চিন্তা করেছেন? এর পাশাপাশি বিজেপি-শাসিত ভারতবর্ষে সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, মাননীয় বিচারপতি কি এই অসম্ভব কল্পনাতেই আমাদের বিশ্বাস রাখতে বলেছেন? তাহলে তো আমাদের বোধহয়, হিটলারের তরফেও ইহুদীদের প্রতি সুবিচার অথবা নেতানিয়াহুর তরফেও প্যালেস্তিনীয় নাগরিকদের প্রতি সহমর্মিতা আশা করা উচিত! সর্বোপরি, যে সংখ্যক ভোটার এই মুহূর্তে লিঙ্গ-ধর্ম নির্বিশেষে কমিশনের সিদ্ধান্তের কারণে ‘বিচারাধীন’ অথবা ‘ডিলিটেড’ অবস্থায় রয়েছেন, সেই সংখ্যক ভোটারের অনুপস্থিতি গাণিতিক ভাবেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। নির্বাচন কমিশনের তরফে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, “একজনও বৈধভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়বে না,” কমিশন স্বয়ং আজ সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছে কি? রাজনৈতিক দলগুলির তরফেও এই নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট আন্দোলনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে না। সকলেই ভোট-উৎসবের উদ্বাহু-উদযাপনে রত।
আবারও এই প্রসঙ্গে তাই মুসলিম মেয়েদের কথাই সামনে তুলে আনব। সংখ্যালঘু, অনগ্রসর, পর্দানসীন, এমন অনেক বিশেষণেই তো আমরা তাঁদেরকে ভূষিত করে আনন্দিত হই। আজকের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যিই তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত বলে মনে করছি? এই প্রশ্ন কেবল দরিদ্র, সংখ্যালঘু, মুসলিম নারীর ক্ষেত্রেও নয় – এই প্রশ্ন প্রত্যেক যুঝতে থাকা নারীর পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক দলিত, প্রত্যেক পরিযায়ী শ্রমিক, প্রত্যেক গৃহসহায়িকা, প্রত্যেক অনগ্রসর মেয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের অবতারণা আজ। কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে তো বটেই, সাধারণ পাঠক হিসেবে আপনাদের প্রতিও আমার বিনম্র অনুরোধ থাকবে, একটিবার অন্তত নিজের বাস্তববুদ্ধিতে এমন সব মেয়েদের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করান। স্বাধিকার রক্ষায় যে সকল পরিষেবা-সুবিধা আপনি স্বয়ং ভোগ করে থাকেন, চেষ্টা করুন এই সব মেয়েদের পরিসরে তেমন প্রতিটি সুবিধা ও পরিষেবা কতখানি সহজলভ্য, একটিবারে তার তূল্যমূল্য বিচার করে দেখতে।
এরপরেও যদি আপনার মনে হয়, “এসব বাজে কথা, আসলে ‘ওদের’ সবক শেখানোই উচিত,” মাপ করবেন – জানবেন, আপনার গণতন্ত্রে রামা কৈবর্ত অথবা হাসিম শেখ, কারোরই জায়গা নেই।
0 Comments
Post Comment