প্রেমের অপরাধে

  • 30 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 173 view(s)
  • লিখেছেন : মীরা কাজী
ধনী দেশ সৌদি আরব। একদিকে তেল, অন্যদিকে হজ। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে নেওয়া অর্থে ধনী হয়েছে। তাই দরিদ্র দেশের নাগরিকদের শ্রমে ওরা আয়াসে থাকে, আর ইচ্ছে-শাসনে লাশ বানিয়ে তাঁদেরই দেশে ফেরত পাঠায়। এই সব কিছু জানার পরেও শত শত মুসলমান জান্নাত লাভের আশায়, হয়ত কেউ কেউ হাজার পাপকর্ম করার পর নিষ্পাপ হবার মোহে কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে হজ, ওমরা করতে ওখানেই হাজির হবে।

আজ যখন মানুষ মহাশূন্যে অবাধে বিচরণ করছে, সেখানে বসতি স্থাপন করবার  পরিকল্পনা করছে ,উন্নত এবং উন্নয়নশীল  দেশগুলোতেও  দু-জন মানুষের একত্র  বসবাসের  ক্ষেত্রে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি  যখন প্রায়শই  গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই সময়কালে  দাঁড়িয়ে  পৃথিবীর  একটি দেশে  প্রেম এবং আবেগ জনিত কারণে চুম্বন করার (বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী)  অপরাধে বাংলাদেশের  প্রাপ্ত বয়স্ক দু-জন নর নারীর মুণ্ড কেটে ফেলা হল। ভাবতে গিয়ে দিশা হারিয়ে ফেলছি। তবে কি মানসিকতার দিক দিয়ে মানুষ আজও সেই মধ্য যুগেই পড়ে আছে? 

 

প্রেম করার অপরাধে প্রেমিক -প্রেমিকার  মৃত্যুদণ্ড  কোনও নতুন ঘটনা নয়। কালে কালে, যুগে যুগে তা সংঘটিত হয়েছে- ইতিহাস তার সাক্ষী। অসবর্ণ  বিবাহের কারণে  নিজের পরিবারের  লোকের হাতে মরতে হচ্ছে  এমন খবর ইদানীং কালেও অমিল নয়। তবে এখানে দেশ বা রাষ্ট্র জড়িত থাকে না। মূলত  শিক্ষার অভাব, কুসংস্কার  জনিত কারণ অথবা প্রতিশোধ স্পৃহা এর জন্য দায়ী থাকে। এক্ষেত্রে দোষীরা  রেহাই পায় না।  আইন যথাযথ প্রয়োগ হলে, দোষীদের শাস্তি ভোগ করতে হয়। 

 

কিন্তু ১৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে  সৌদি আরবে বাংলা দেশের নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের সাথে  ঘটে যাওয়া খবরটি শুনে স্তম্ভিত হতে হয়। সারা পৃথিবীতে এই ঘটনার  চর্চা চলছে। সৌদি সরকার  এই শাস্তির বিধান দিয়েছে এবং  সর্বসমক্ষে নাকি বাংলাদেশের নাগরিক  নজরুল এবং সুইটির শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। 

 

আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসারে   বাংলাদেশের  দূতাবাসকে এই ব্যাপারে অবহিত করার কথা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তাদের সম্পুর্ণ অন্ধকারে রেখে  এই  বর্বরোচিত,মধ্যযুগীয় অপকর্মটি  সেরে ফেলা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরেও জানানো হয়নি। আরব দেশের  কিছু পত্র-পত্রিকা থেকে খবরটা ফাঁস হয়েছে।

 

শোনা যাচ্ছে – নজরুল এবং সুইটিকে  তিন বছর সৌদির জেলখানায়  রাখা হয়েছিল। বিচার নামক একটা প্রহসনও নাকি  হয়েছিল। ঠিকঠাক কোনো  দোভাষী ছিল কি না তাও জানা যাচ্ছে না। ফলে, ভাষাগত সমস্যার কারণে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোরকম  সুযোগ হয়ত তাঁরা পাননি। নীরবে, বিনা প্রতিবাদে মৃতুদণ্ড মেনে নেওয়া ছাড়া  উপায় ছিল না। নিজের রাষ্ট  বাংলাদেশ থেকেও প্রত্যাশিত সাহায্য পাওয়ার সুযোগ হয়নি। আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারে ছেলে মেয়ে হওয়ার কারণে  তাদের পরিবারও  বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের  কাছে দরবার করার মত উদ্যোগ  নিতে পারেনি। এত বড় দুর্ঘটনা  যে ঘটতে পারে এটা তাঁদের  কল্পনাতেও  ছিল না। সৌদি আরবের কারা জীবন শেষ করে তাঁরা দেশে ফিরে আসবেন এই প্রত্যাশাতেই ছিলেন তাঁদের পরিবার। 

 

নজরুল–সুইটিও কি এই পরিণতি কল্পনা করতে পেরেছিলেন? শিরশ্ছেদের দু’সপ্তাহ আগে সুইটি পরিবারের সঙ্গে নাকি কথা বলেছিলেন। তখন কি পেয়েছিলেন তাঁর সাজার ঘোষণা? নাকি  আচমকা নেমে এসেছিল সেই মৃত্যু ঘণ্টা! মৃত্যুর আগের মুহুর্তে নিজ দেশ, নিজ পরিবার পরিজনহীন অবস্থায় তাদের শেষ ইচ্ছা কী ছিল কেউ জানল না। কোথাও থেকে একটা “আহা” শব্দও উঠল না। কেবল  দুটি  ছিন্ন মস্তক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মরুভুমির শুকনো বালিতে কিছু রক্তলেখা লিখে দিয়ে  গেল। সে লেখা পড়বার  জন্য অবশ্য কেউ ছিল কি না জানিনা। 

   

মৃত্যুর আগে তাদের দেশ,পরিবারকে কিছু জানানো হল না, কিন্তু লাশ দুটিকে সুদৃশ্য কফিনে বন্দী করে পাঠানোর ক্ষেত্রে  একটুও  গাফিলতি করেনি। এর থেকে লজ্জার কী হতে পারে?

 

এখানে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়-  আধুনা সৌদি আরবে বার ওপেন করা হয়েছে, ক্যাবারে ওপেন হয়েছে, সেখানকার নারীদের খোলামেলা পোশাকে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের  যে সমস্ত মহিলারা ওই দেশে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন তাঁদের  স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায় যে, বেশিরভাগ বাড়ির মালিক এবং একইসঙ্গে মালিকের পুত্রের  দ্বারা প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হন তাঁরা। যতদূর জানি, শরিয়তি আইনে পরনারীর সাথে  যৌনাচারের  কঠিন শাস্তির বিধান  আছে। সেখানে এই আইনের প্রয়োগ দেখা যায় না কেন? তাহলে এই আইন বা শাস্তি কি কেবল গরীব দেশের  নাগরিকদের জন্য? এর কোনো উত্তর নেই। ধনী দেশ সৌদি আরব। একদিকে তেল, অন্যদিকে হজ। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে নেওয়া অর্থে ধনী হয়েছে। তাই দরিদ্র দেশের নাগরিকদের শ্রমে ওরা আয়াসে থাকে, আর ইচ্ছে-শাসনে লাশ বানিয়ে তাঁদেরই দেশে ফেরত পাঠায়। এই সব কিছু জানার পরেও শত শত মুসলমান  জান্নাত লাভের আশায়, হয়ত কেউ কেউ হাজার পাপকর্ম করার পর নিষ্পাপ হবার মোহে কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে হজ, ওমরা করতে ওখানেই হাজির হবে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক 

ছবি: সংগৃহীত      

0 Comments

Post Comment